২০২৪ সাল

শীর্ষ অস্ত্র কোম্পানিগুলোর প্রায় ৬৮ হাজার কোটি ডলারের রেকর্ড আয়

ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংঘাত ছিল তুঙ্গে, বিশেষ করে ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধে মারণাস্ত্রের ব্যবহার ছিল গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ মাত্রায়।

ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংঘাত ছিল তুঙ্গে, বিশেষ করে ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধে মারণাস্ত্রের ব্যবহার ছিল গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ মাত্রায়। বিশ্বব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংঘাতে গত বছর ব্যাপক প্রাণহানির বিপরীতে বিপুল পরিমাণ মুনাফা করেছে অস্ত্রবিক্রেতারা। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এসআইপিআরআই) গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের শীর্ষ ১০০ অস্ত্র নির্মাতা কোম্পানি ২০২৪ সালে অস্ত্র ও সামরিক পরিষেবা বিক্রি বাবদ ৬৭ হাজার ৯০০ কোটি ডলার আয় করেছে। এ সময় কোম্পানিগুলোর ২০২৪ সালের তুলনায় আয় বেড়েছে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ।

২০১৮ সালের পর গত বছরই প্রথম বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ অস্ত্র কোম্পানির আয় একসঙ্গে বেড়েছে। এসআইপিআরআইর তথ্য অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী অস্ত্র ব্যবসার রেকর্ড আয়ের বড় একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপভিত্তিক কোম্পানিগুলোর দখলে। গত বছর এশিয়া ও ওশেনিয়া বাদ দিয়ে সব অঞ্চলেই প্রবৃদ্ধির দেখা পেয়েছে অস্ত্র ব্যবসা।

বিশ্বব্যাপী গত বছর অস্ত্রের উৎপাদন ও বিক্রি বৃদ্ধির পেছনে গাজায় ইসরায়েলি হামলা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছে এসআইপিআরআই। সংস্থাটির মিলিটারি এক্সপেনডিচার অ্যান্ড আর্মস প্রডাকশন প্রোগ্রাম বিভাগের গবেষক লরেঞ্জো স্কারাজাটো বলেন, ‘গত বছর বৈশ্বিক অস্ত্র খাতের আয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ক্রেতা চাহিদা মেটাতে কোম্পানিগুলোকে উৎপাদন লাইন, কারখানার পরিসর বৃদ্ধি বা অধিগ্রহণ চুক্তি করতে হয়েছে। তবে উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোর পরও এখনো কোম্পানিগুলো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি রয়েছে, যার ফলে এগুলোর খরচ ও সরবরাহ শিডিউল প্রভাবিত হতে পারে।’

বিশ্বের ১০০টির শীর্ষ অস্ত্র কোম্পানির মধ্যে ৩৯টিই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক। এর মধ্যে ৩০টির আয় গত বছর বেড়েছে। এসব মার্কিন কোম্পানির সম্মিলিত আয় ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৩৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে লকহিড মার্টিন, নরথ্রপ গ্রুম্যান ও জেনারেল ডায়নামিকস। তবে এ আয় বৃদ্ধির পরও মার্কিন কোম্পানিগুলোর এফ-৩৫ ফাইটার জেট, কলাম্বিয়া ও ভার্জিনিয়া-ক্লাস সাবমেরিন ও সেনটিনেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইলের মতো প্রকল্প বাজেট জটিলতায় ভুগছে।

স্টকহোমভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদন অনুসারে, ইলোন মাস্কের কোম্পানি স্পেসএক্স প্রথমবারের মতো শীর্ষ বৈশ্বিক সামরিক সরঞ্জাম নির্মাতাদের তালিকায় স্থান পেয়েছে। কোম্পানিটির অস্ত্র বিক্রি বাবদ আয় দ্বিগুণ হয়ে ১৮০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এছাড়া প্রথমবারের মতো তালিকায় প্রবেশ করেছে ইন্দোনেশিয়ার ডিইএফইএনডি আইডি, কোম্পানিটির আয় ৩৯ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১১০ কোটি ডলার।

শীর্ষ ১০০ অস্ত্র নির্মাতা কোম্পানির তালিকায় রাশিয়া বাদ দিয়ে ইউরোপের কোম্পানি আছে ২৬টি। এর মধ্যে ২৩টিরই আয় বেড়েছে। এসব কোম্পানির সম্মিলিত আয় ১৩ শতাংশ বেড়ে ১৫ হাজার ১০০ কোটি ডলার হয়েছে। এর মধ্যে ইউক্রেনের জন্য আর্টিলারি শেল উৎপাদনকারী চেক কোম্পানি চেকস্লোভাক গ্রুপের আয় ১৯৩ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৩৬০ কোটি ডলার। এটি শীর্ষ ১০০ কোম্পানির মধ্যে আয় বৃদ্ধির হারে সর্বোচ্চ। জেএসসি ইউক্রেনিয়ান ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রির আয় ৪১ শতাংশ বেড়ে ৩০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। তালিকায় স্থান পাওয়া রুশ দুই কোম্পানি রসটেক ও ইউনাইটেড শিপবিল্ডিং করপোরেশনের সম্মিলিত আয় ২৩ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ১২০ কোটি ডলার।

এসআইপিআরআই বলছে, ইউক্রেনে রাশিয়াকে মোকাবেলায় ইউরোপের দেশগুলো উৎপাদনক্ষমতা বাড়িয়ে তুলছে। তবে দুষ্প্রাপ্য খনিজের ওপর চীনের রফতানি নিয়ন্ত্রণ এসব কোম্পানির জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে পারে।

তবে এ সময় এশিয়া ও ওশেনিয়ার অস্ত্র নির্মাতাদের আয় কমেছে। এসব কোম্পানির আয় আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ২ শতাংশ কমে হয়েছে ১৩ হাজার কোটি ডলার। এর মধ্যে চীনভিত্তিক আটটি কোম্পানির সম্মিলিত আয় কমেছে ১০ শতাংশ। বিশেষ করে স্থলযুদ্ধের জন্য সরঞ্জাম উৎপাদনকারী কোম্পানি এনওআরআইএনসিওর আয় কমেছে ৩১ শতাংশ।

এসআরপিআরআইর মিলিটারি এক্সপেনডিচার অ্যান্ড আর্মস প্রডাকশন প্রোগ্রাম বিভাগের পরিচালক নান তিয়ান বলেন, ‘চীনে অস্ত্র ক্রয়ে দুর্নীতির অভিযোগের কারণে ২০২৪ সালে বড় সমরাস্ত্র সরবরাহ চুক্তি স্থগিত বা বাতিল হয়েছে। এটি দেশটির সামরিক আধুনিকায়ন ও নতুন সক্ষমতা বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে।’

অন্যদিকে ইউরোপীয় ও স্থানীয় গ্রাহকদের মধ্যে শক্তিশালী চাহিদা দেখেছে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার অস্ত্র নির্মাণ খাত। এতে তাইওয়ান ও উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে উত্তেজনার বিশেষ অবদান রয়েছে।

জাপানের পাঁচ অস্ত্র কোম্পানির সম্মিলিত আয় গত বছর ৪০ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৩৩০ কোটি ডলার। দক্ষিণ কোরিয়ার চার কোম্পানির আয় ৩১ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৪১০ ডলার। দেশটির সবচেয়ে বড় অস্ত্র কোম্পানি হানওয়া গ্রুপের আয় বেড়েছে ৪২ শতাংশ, যার অর্ধেকের বেশি এসেছে রফতানি বাবদ।

প্রথমবারের মতো তালিকার শীর্ষ ১০০ কোম্পানির মধ্যে উঠে এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের নয়টি প্রতিষ্ঠান। এ সময় কোম্পানিগুলো সম্মিলিতভাবে ৩ হাজার ১০০ কোটি ডলার আয় করেছে, যা আগের তুলনায় ১৪ শতাংশ বেশি। তবে তথ্যের অভাবে তালিকায় ঠাঁই পায়নি সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) এজ গ্রুপ।

তালিকায় থাকা ইসরায়েলি তিনটি অস্ত্র কোম্পানির আয় ১৬ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৬২০ কোটি ডলার। গাজায় ইসরায়েলি হামলার রসদ সরবরাহ করতে গিয়ে উৎপাদন বাড়িয়েছে কোম্পানিগুলো। এ সময় ৭০ হাজারের মতো ফিলিস্তিনিকে হত্যার পাশাপাশি পুরো গাজার অবকাঠামো ধ্বংস করে দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। এসআইপিআরআই জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসরায়েলে নির্মিত মনুষ্যবিহীন আকাশযান ও ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চাহিদা বেড়েছে। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ায় দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা কোম্পানি রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্সের আয় বেড়েছে।

এ তালিকায় তুর্কি কোম্পানি পাঁচটি। ২০২৪ সালে এগুলোর সম্মিলিত আয় ১১ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ১০ কোটি ডলার হয়েছে।

আরও